Realizing Dreams

২০ এপ্রিলের প্রথম আলোর নারীমঞ্চে রাজিয়া নাজমির বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ পড়লাম। বিচ্ছেদ শব্দের সঙ্গে আমরা এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যতটা পরিচিত, আমাদের আগের প্রজন্ম ততটা পরিচিত ছিল না। আমরা এখনো এই শব্দটা শুনলে হোঁচট খাই, মনটা বিষাদে ভরে ওঠে, যদি কারও বিচ্ছেদ হয়। হয়তো পরের প্রজন্ম এটাকে আরও সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নেবে। আমরা অনেক বেশি স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চাই না। তাই এত বিচ্ছেদ। স্বামী তাঁর স্ত্রীর জন্য যেমন এতটুকু ছাড় দিতে রাজি নন, তেমনি স্ত্রীও তাঁর জায়গায় অনড়। সেটা প্রেমের বিয়েই হোক বা সম্বন্ধ করা বিয়ে।

লেখকের মতে, মারপিট আর গালাগালির জন্য শুধু সংসার ভাঙে না। মনের মিল না হলেই তা যথেষ্ট। তবে মনের মিল হলেও অনেক সময় শ্বশুর-শাশুড়ির নির্যাতন, ছেলেকে একান্তই নিজের মনে করা, বউকে সহ্য করতে না পারা ছাড়াও বাবার বাড়ি থেকে বউ কী নিয়ে এল—এসব নিয়েও অনেক সময় সংসার ভাঙে। নিম্নবিত্ত পরিবারে যৌতুক যেমন বিচ্ছেদের একটা বড় কারণ, তেমন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে সংসার সাজিয়ে দেওয়াও একধরনের যৌতুক, যে কারণে অনেক শাশুড়িই ছেলের বউদের এখনো কথা শুনিয়ে যান।
আমার পরিচিত এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে হঠাৎ করে। ছেলে ও মেয়ে কারও পরিবারই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা পালন করার সময় পায়নি। যেহেতু বউটি তাঁর বাড়ি থেকে খাট-পালঙ্ক, টিভি-ফ্রিজ আনতে পারেননি, তাই তাঁকে যেকোনো অজুহাতে শাশুড়ি এ কথা শুনিয়ে দেন। যদিও বউটি চাকরি করেন আর বেতনের সব টাকা শাশুড়ির হাতেই তুলে দেন; প্রেমের বিয়ে হলেও এ ক্ষেত্রে তাঁর স্বামীর মতও শাশুড়ির মতোই। তিনিও মনে করেন, তাঁকে খুব সহজেই জামাই হিসেবে পেয়েছে মেয়েটির বাবা-মা। এখনো তাঁদের বিচ্ছেদ হয়নি, তবে বিয়ের এক বছরের মাথায় মেয়েটি যে বিচ্ছেদের কথা ভাবছে, তা আমি জানি।

লেখকের মতো আমিও বিশ্বাস করি, ভালোবাসা ছাড়া সংসার করা যায়, সম্মান ছাড়া যায় না। তবে শুধু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই নয়, সংসারের জন্য দরকার পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সহানুভূতি। লেখক বিবাহবিচ্ছেদকে দেখেছেন অনেক সাদামাটাভাবে, যেন চাইলেই পাওয়া যায়। লেখকের এক বান্ধবী যেমন তাঁর স্বামীকে ‘তোমার সঙ্গে ঘর করতে চাইছি না’ বলেই বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিলেন। বিচ্ছেদ কিন্তু এতটা সহজ নয়। আমার খুবই কাছের এক উচ্চশিক্ষিত বান্ধবী স্বামীর অবহেলা, শ্বশুর-শাশুড়ির নানা মানসিক নির্যাতন সহ্য করেও সংসার করে যাচ্ছে এখনো। মন চাচ্ছে বিচ্ছেদ ঘটাতে কিন্তু পারছে না তার একমাত্র সন্তানের কথা চিন্তা করে। মেয়েটি চাকরি করে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে। অসহায় মেয়েটির বাবা-মা গ্রামে থাকেন এবং তাঁরা দুজনই চাকরিজীবী। আট মাসের ছেলেকে দেখাশোনা করেন মূলত তার শাশুড়িই। হ্যাঁ, সে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। অনেক টাকা বেতন দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আয়া রাখা যায়। তবে সে যে বেতন পায়, তা দিয়ে ঢাকা শহরে সন্তান নিয়ে সচ্ছলভাবে থাকা সম্ভব নয়। আর তাই মেনে নিতেই হয়। কারণ বেশির ভাগ মেয়েই বাচ্চার ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ করতে চান না। তা ছাড়া বিচ্ছেদ ঘটালে সন্তান তার বাবা ও দাদা-দাদির স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে। বিচ্ছেদ না ঘটানোর পেছনে এটাও একটা বড় কারণ। তাই নির্যাতন সহ্য করে তবু বিচ্ছেদ ঘটাতে চান না মেয়েরা।

আরেকটা ব্যাপার আছে, অনেক মেয়েই বিবাহবিচ্ছেদের পর আবার বিয়ের বন্ধনে জড়াতে চান না। সে ক্ষেত্রে লেখিকা যে পাড়াপড়শির কথা বলেছেন, সেই কারণেই শুধু মেয়েদের পক্ষে বিচ্ছেদের পর একা থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। আমিও মনে করি, জীবন একটাই। তাই জীবনকে যতটা পারা যায় ভালোভাবে পার করা। জীবন যেমন শুধু উপভোগের জন্য নয়, তেমনি শুধু কষ্টই সহ্য করতে হবে তা-ও নয়। আমাদের প্রত্যেকের উচিত সব ধরনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জীবনকে সহজভাবে নেওয়া।

লিখেছেনঃ সুলতানা স্বাতী | তারিখ: ২৭-০৪-২০১১  প্রথম আলোতে প্রকাশিত

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: